অধ্যায় ৫ মহিষের দুধের চেইন এবং কিছু দুগ্ধজাত পণ্য
বাংলাদেশের মহিষের দুধের চেইন বেশ বিস্তৃত এবং জায়গা থেকে জায়গা এবং খামার ব্যবস্থা অনুযায়ী পার্থক্য রয়েছে। খামারি ও দুধ সংগ্রহকারীরা সাধারণত প্লাস্টিক বা অ্যালুমিনিয়ামের পাত্রে দুধ বহন করে। দুধ নির্দিষ্ট দুধ সংগ্রহ কেন্দ্রে ও প্রক্রিয়াকরণ কেন্দ্রে নৌকা,মোটরসাইকেল বা ভ্যানে বহন করে নিয়ে যাওয়া হয়। বাংলাদেশের মহিষের দৈনিক দুধ উৎপাদনের শতকরা হার ২.৮লিটার/দিন যা শতকরা সর্বমোট ২২৭ দিনের দুধদানকালের সময়ে হয়। বাংলাদেশের নিজস্ব জাতের মহিষ নিজস্ব জাতের গরুর তুলনায় বেশি দুধ দেয়। যদিও এটি জাত এবং পালন পদ্ধতির ওপর নির্ভর করে। উদাহরণস্বরূপ, ঘরোয়াভাবে পালন করা মহিষ বাথানের মহিষের তুলনায় বেশি দুধ দেয়। যাই হোক, যেখানেও উৎপাদন হোক, মহিষের দুধ শেষ অবস্থান ভোক্তার নিকট বিভিন্নভাবে আসে। নিচের ছবিতে বাংলাদেশে মহিষের দুধের চেইন দেখানো হলো।

৫.১ মহিষ উৎপাদনের এবং দুধের চেইনের প্রতিবন্ধকতাসমূহ
১. মানসম্পন্ন খাবার ও চারণভুমির অভাব।
২. দানাদার খাবারের উচ্চ মূল্য।
৩. পর্যাপ্ত জায়গার অভাব এবং নির্মাণব্যয় বৃদ্ধি পাওয়া।
৪. উচ্চ উৎপাদনশীল জাতের অভাব।
৫. প্রুভেন বুলের অপর্যাপ্ততা।
৬. প্রজননের পরিকাঠামো ও দীর্ঘ মেয়াদী প্রজনন গবেষণা এবং প্রজনন উন্নতির পলিসি তৈরির অভাব।
৭. ধীরগতিতে খাপ খাওয়ানো এবং অপর্যাপ্ত কৃত্তিম প্রজনন সুবিধা।
৮. দক্ষ কৃত্তিম প্রজনন কর্মীর অভাব এবং কৃত্তিম প্রজননে কম গর্ভধারণের হার।
৯. প্রজননে ঋতুর ওপর নির্ভরশীলতা।
১০. প্রাণীকে চিহ্নিত করণ এবং রেকর্ড রাখার কম ব্যবস্থা থাকা।
১১. উচ্চ বাছুর মৃত্যুর হার।
১২. ভ্যাকসিনের অপর্যাপ্ত সরবরাহ।
১৩. সময়ানুযায়ী ভেটেরিনারি সার্ভিসের অপ্রতুলতা।
১৪. দুর্বল বাজার ব্যবস্থাপনা।
১৫. মহিষের দুধের ও মাংসের মান সম্পর্কে কম জ্ঞান।
১৬. দুধ পরিবহন ও সংরক্ষণের উপযুক্ত জায়গার অভাব।
১৭. খামারের নিম্ন মানের জৈব নিরাপত্তা এবং কম স্বাস্থ্যসম্মত দুধ।
১৮. দুধ এবং দুগ্ধজাত পণ্যে জুনোটিক জীবাণুর উপস্থিতি।
১৯. বিভিন্ন পর্যায়ের স্টেকহোল্ডারদের মাঝে সমন্বয়ের অভাব।
২০. বৈশ্বিক উষ্ণতার প্রভাব। (পানির উচ্চতা ও লবণাক্ততা বৃদ্ধি)।
৫.২ মহিষের দুগ্ধজাত পণ্য
দুগ্ধজাত পণ্য তৈরিতে সবচেয়ে প্রয়োজনীয় উপাদানগুলোর একটি হল মহিষের দুধ। বাংলাদেশে মহিষের দুধ থেকে বিভিন্ন দুগ্ধজাত পণ্য তৈরি করা হয় যেমন টক দৈ, মিষ্টি দৈ, ঘি, পনির, মাখন এবং অন্যান্য মিষ্টি। এই সমস্ত দুধের পণ্যের মধ্যে দৈ এবং মিষ্টি সবচেয়ে জনপ্রিয় এবং মহিষের দুগ্ধজাত পণ্যের মাঝে অন্তর্ভুক্ত। দুগ্ধজাত পণ্য তৈরিতে গরুর দুধের তুলনায় মহিষের দুধ অর্থনৈতিকভাবে বেশি লাভজনক। উদাহরণস্বরূপ, ১ কেজি মাখন তৈরিতে যেখানে ১৪ কেজি গরুর দুধ লাগে সেখানে মাত্র ১০ কেজি মহিষের দুধ ব্যবহার করা যায়।
৫.২.১ দৈ/ইয়োগার্ট
দৈ, দহি, দধি বা ইয়োগার্ট বাংলাদেশ ও ভারতের একটি নিজস্ব ফার্মান্টেড দুগ্ধজাত পণ্য যা স্ট্রেপটোকক্কাস ল্যাক্টিস, ল্যাকটোব্যাসিলাস বুলগারিস, এস. থার্মোফিলাস, এস. সাইট্রোফিলাস, এল. প্ল্যানটেরাম ইত্যাদির কালচার মিশ্রিত করে তৈরি করা হয়। বাংলাদেশে শুধুমাত্র মহিষের দুধ থেকে অথবা গরু ও মহিষের দুধের মিশ্রণ থেকে দৈ তৈরি করা হয়।
গরুর দুধের দৈ থেকে মহিষের দুধের দৈ বেশি ঘন ও ক্রিমযুক্ত এবং একটি আলাদা স্বাদসহ সুগন্ধ এবং মসৃণতা থাকে। এটি বেশ পুষ্টিকর যাতে প্রাকৃতিক ভিটামিন (ভিটামিন এ, বি১২) এবং খনিজ (সোডিয়াম, ক্যালসিয়াম, পটাসিয়াম এবং ম্যাগনেসিয়াম) থাকে। মহিষের দৈ এ অম্লের পরিমাণ বেশি থাকে যা মানুষের অন্ত্রে গ্যাস তৈরিতে বাধা দেয়। এছাড়া দৈ রক্তের কোলেস্টেরল কমাতে সাহায্য করে।

৫.২.২ রসমালাই (মিষ্টি)
রসমালাই ছানা (এক ধরনের ছানা যা রসগোল্লা নামে পরিচিত) দিয়ে তৈরি ছোট ছোট গোলাকার মিষ্টি যা মালাই (জমানো ক্রিম) এ ডুবানো থাকে এবং এলাচ দিয়ে সুগন্ধযুক্ত করা হ্য়। এটাকে ওপরে শক্ত আবরণবিহীন ঘন পনিরের কেক এর সাথে তুলনা করা যায়। এটি গরু এবং মহিষের দুধকে মিশ্রিত করে তৈরি করা হয়। এই মিষ্টি সব সময় ঠাণ্ডা অবস্থায় পরিবেশন করতে হয়।
মহিষের দুধ থেকে তৈরি রসমালাই এ উচ্চ আমিষ, বিভিন্ন সম্পৃক্ত ফ্যাটি এসিড ও প্রয়োজনীয় অ্যামাইনো এসিড থাকে। মহিষের দুধ থেকে তৈরি রসমালাই অধিকাংশ সময় জমাট, আঠালো, ভঙ্গুর ও শক্ত হয় যায় বলে প্রচলিত আছে। কিন্তু রাসায়নিক উপাদান (সলিড, আমিষ, চর্বি ইত্যাদি) এবং অর্থনৈতিক দিক থেকে গরুর দুধের তুলনায় মহিষের দুধের রসমালাই অধিকতর উত্তম।
ছবি ৫.৩: রসমালাই
৫.২.৩ ঘি (ক্ল্যারিফাইড মাখন)
ভারতীয় উপমহাদেশে সাধারণত রান্নার কাজে ঘি ব্যবহার করা হয় যেমন ঐতিহ্যবাহী চালের খাবার (বিরিয়ানি) তৈরিতে। এটি বিটা-ক্যারোটিন, ভিটামিন এ, ডি এবং কে, স্বাস্থ্যকর ফ্যাটি এসিডসমূহ (যেমন কনজুগেটেড লিনোলিক এসিড এবং বিঊটাইরিক এসিড) এবং ওমেগা-৩ সমৃদ্ধ। ঘি হাড়কে শক্ত করে, পরিপাকে সাহায্য করে ও কোষ্ঠকাঠিন্য দুর করে, স্বাস্থ্যকর ওজন বজায় রাখতে সাহায্য করে এবং একটি ভালো রুচি ও ঘুমের সুযোগ করে দেয়।
ছবি ৫.৪: ঘি
৫.২.৪ মাখন
মহিষের দুধে (৭.০-৯.৫%) গরুর দুধের তুলনায় বেশি চর্বি থাকে। এ কারণে প্রতি লিটার মহিষের দুধ হতে গরুর দুধের তুলনায় বেশি মাখন পাওয়া যায়। ক্রীমকে মন্থন করার মাধ্যমে মাখন তৈরি হয় যতক্ষন পর্যন্ত কঠিন ও তরল উপাদান আলাদা না হয় যেগুলো বাটারফ্যাট ও বাটারমিল্ক নামে পরিচিত। এই বাটারফ্যাটটি মাখন নামে পরিচিত।
মহিষের দুধের মাখন সাদাটে, একটি বিশেষ মিষ্টি স্বাদ থাকে এবং অনেকটা শক্ত প্রকৃতির হয়ে থাকে। এটি বিভিন্ন ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হয়, রান্না ছাড়া এবং পরটা ও সবজি রান্নায় ব্যবহার করা হয়।

ছবি ৫.৫: মহিষের দুধের মাখন
৫.২.৫ পনির
বেশি চর্বি থাকার ফলে মহিষের দুধ থেকে ভালো মানের পনির তৈরি হয়। সারা বিশ্বে অধিকাংশ ক্ষেত্রে মোজ্জারেলা, সুরতি পনির, মিশরের দমিয়াটি এবং দক্ষিণ ও মধ্য আমেরিকার কুয়েসো ব্লাঙ্কো পনির মহিষের দুধ থেকে তৈরি হয়।
মোজ্জারেলা পনির ইতালির একটি ঐতিহ্যবাহী মহিষের দুধের পণ্য। এ ছাড়া এটি সুইজারল্যান্ড, আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, চীন, জামান, ইংল্যান্ড, কলম্বিয়া, থাইল্যান্ড, ইজরাইল, মিশর, ভারত এবং দক্ষিণ আফ্রিকাতে তৈরি হয়। এটিকে অধিকাংশ সময় ভূমধ্যসাগরীয় রান্নার রাণী, সাদা সোনা বা টেবিলের মুক্তো বলা হয়। এর উত্তম স্বাদ, কিছুটা টক ভাব, বহুমুখিতা (যেহেতু এটি যে কোন উপাদানে মিশ্রিত করা যায়), নমনীয়তা, বিশেষ গন্ধ এবং দুধ সাদা রঙের জন্য সুপরিচিত।
গরুর দুধের তুলনায় মহিষের দুধের তৈরি মোজ্জারেলা পনিরে উচ্চ মাত্রায় ভিটামিন এ, ই ও ক্যালসিয়াম থাকে। এতে কম পরিমাণে ল্যাকটোজ থাকে যা কিছু লোকের হজমের জন্য সহজ।
সুরতি পনির নরম হয় যা মহিষের দুধ থেকে তৈরি হয় এবং এটি রেনেট জমাট বাধার মাধ্যমে হয়। পর্তুগিজ রান্না পনির দ্বারা বেশ প্রভাবিত। এটা সুরাত যা গুজরাটের একটি শহরের নাম, পশ্চিম ভারতের একটি প্রদেশ থেকে নেয়া হয়েছে, যেখান থেকে এটি প্রথম উদ্ভব হয়েছে বলে ধারণা করা হয়।


ছবি ৫.৭: সুরতি পনির
৫.২.৬ খোয়া
খোয়া, খইয়া বা মাওয়া মহিষ ও গরুর দুধ থেকে তৈরি একটি দুগ্ধজাত পণ্য যা ভারতীয় উপমহাদেশের রান্নায় অনেক জনপ্রিয়। এটি মূলত সম্পূর্ণ দুধকে শুকিয়ে ফেলার মাধ্যমে বা দুধকে একটি লোহার পাত্রে জ্বাল দিয়ে ঘন করার মাধ্যমে তৈরি করা হয়। এতে অন্যান্য পনিরের তুলনায় কম আর্দ্রতা থাকে

ছবি ৫.৮; খোয়া
References
- M. R. Habib, M. M. H. Khandakar, M. A. Islam, M. M. Sarkar, M. K. Alam, M. K. Rahman, M. M. Sharmin, M. M. Hannan and M. A. Islam, “Status of the buffalo milk trade and dairy manufacturing business at Bhola district of Bangladesh, and opportunities for buffalo milk products branding,” Res. Agric. Livest. Fish., vol. 8, no. 3, pp. 301-310, 2021.
- FAOSTAT, The State of Food and Agriculture, Rome, Italy: Food and Agriculture Organization of the United Nations (FAO), 2012.
- A. Nahar, M. Al-Amin, S. Alam, A. Wadud and M. Islam, “A Comparative Study on the Quality of Dahi (Yoghurt) Prepared from Cow, Goat and Buffalo Milk,” International Journal of Dairy Science, vol. 2, pp. 260-267, 2007.
- M. Islam, M. Alam, M. Islam, M. Khan, D. Ekeberg, E. Rukke and G. Vegarud, “Principal milk components in buffalo, holstein cross, indigenous cattle and Red Chittagong Cattle from Bangladesh,” Asian-Australasian Journal of Animal Science, vol. 27, pp. 886-897, 2014.
- A. Asif, G. Deb, M. Habib, M. Rashid, M. Sarker, U. Shahjadee, S. Lisa, S. Ahmed, D. Ekeberg, E. Vargas-Bello-Pérez and M. Islam, “Variations in the fatty acid and amino acid profiles of doi and rasomalai made from buffalo milk,” Journal of Advanced Veterinary and Animal Research, vol. 8, no. 3, p. 511–520, 2021.
- W. A. Sayedatunnesha, M. Islam, M. Islam and M. Hossain, “Comparative Study of The Quality of Rasomalai Manufactured from Cow and Buffalo Milk,” Bangladesh Journal of Animal Science, vol. 37, 2012.
- Kaaveri, “10 Surprising Benefits of Buffalo Ghee!” 2023. [Online]. Available: https://blog.standardcoldpressedoil.com/buffalo-ghee/
- G. Arora, “Ghee Health Benefits: Here’s How Much Ghee You Should Eat Every Day,” 2019. [Online]. Available: https://www.ndtv.com/health/ghee-health-benefits-heres-how-much-ghee-you-should-eat-every-day-2147106
- M. A. Zava and M. Sansinena, “Buffalo Milk Characteristics and By-Products,” in The Buffalo (Bubalus bubalis) – Production and Research, G. A. Presicce, Ed., Bentham Science Publishers, 2017, pp. 262-297.
- Wikipedia, “Ras malai,” 2022. [Online]. Available: https://en.wikipedia.org/wiki/Ras_malai [Accessed 25 January 2023].
- H. Bekiroğlu and S. Özdemir, “The quality of ice cream samples made from buffalo milk,” Food and Health, vol. 6, no. 1, pp. 20-26, 2020.

