মহিষে অবহেলা বাংলাদেশঃ কাজে লাগাচ্ছে পার্শ্ববর্তীদেশ
আমাদের প্রতিবেশি দেশগুলোর দুধের মার্কেট শেয়ারের বৃহৎ অংশ যেখানে মহিষের সেখানে অমরা কেবল গরুর দিকেই তাকিয়ে আছি। বিশ্বের মধ্যে সর্বাধিক উৎপাদন ও রপ্তানিকারক দেশ ভারতের ৫৬% এবং নেপাল ও পাকিস্তানের যথাক্রমে ৭০% ও ৬৩% মার্কেট মিল্ক আসে মহিষ থেকে। কিন্তু বাংলাদেশের মার্কেট মিল্কের মাত্র ৪ শতাংশ আসে মহিষ থেকে। এই জন্য আমাদের অবহেলা ও ভ্রান্ত ধারণা এই দুইই দায়ী। অন্যদিকে আমরা দুধের প্রাপ্যতা থেকে পিছিয়ে পড়ছি। একজন সুস্থ মানুষের জন্য দৈনিক ২৫০ মিলি দুধের প্রয়োজন হলেও বাংলাদেশে আমরা পাচ্ছি মাত্র ১৫৮ মিলি।
গ্রাম বাংলায় প্রাচীনকাল থেকেই ব্যাপকভাবে মহিষ পালনের প্রচলন থাকলেও সাম্প্রতিক সময়ে নগরায়ন প্রভাবে মহিষ পালন এখন অনেকটা সীমিত হয়ে এসেছে। বর্তমানে বাংলাদেশে জলাভূমি (হাওড়, বাওড় ইত্যাদি) কমে এলেও বাংলাদেশে উপকূলীয় এলাকাগুলিতে বাগেরহাট, সাতক্ষীরা, ফেনী, নোয়াখালী, লক্ষীপুর, মিরসরাই সহ কক্সবাজার উপকূলীয় এলাকায় এখনও ব্যাপকভাবে মহিষ পালন করা হয়। মহিষ পালনের তুলনামূলক সম্ভাবনাসমূহ এভাবে ব্যাখ্যা করা যেতে পারে। উপকূলীয় এলাকাসমূহে প্রাকৃতিক খাদ্যের প্রাচুর্যের কারণে মহিষ পালনের মাধ্যমে প্রান্তিক কৃষকদের আর্থিকভাবে লাভবান হওয়ার যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে। মহিষের দুধে ফ্যাট (%) বেশি হওয়ার কারণের তা তুলনামূলক ভাবে গাভীর দুধ থেকে বেশি সুস্বাদু ও উপকারী। উল্লেখ্য যে মহিষের দুধ থেকে তৈরি দই বাংলাদেশ সহ বিশ্বের সর্বস্তরের মানুষের কাছে ব্যাপকভাবে সমাদৃত। এছাড়াও মহিষ দুধ থেকে উৎপাদিত পনির বহির্বিশ্বে অন্যতম গুনগত ও জনপ্রিয় খাদ্য হিসাবে সুপ্রচলিত। আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে বিংশ শতাব্দীতে ‚হোয়াইট রেভুলিউশান“ এর জন্য মহিষ থেকে উৎপাদিত দুধের অবদান সর্বাধিক বেশি বলে বিবেচনা করা হয়। বৈশ্বিক মহিষ পালন সমীক্ষা থেকে দেখা যায়, বর্তমানে বিশ্বে প্রায় ১৮০ মিলিয়ন এর মধ্যে ভারতে মহিষ এর সংখ্যা ১০৫.১ মিলিয়ন যা সার্বিক মহিষ সংখ্যার ৫৬.৭% (Ref: Click here)। ২০১৬ সালে প্রকাশিত এক গবেষণা থেকে জানা যায় যে, বাংলাদেশে মহিষ এর সংখ্যা ১.৫ মিলিয়ন যা সার্কভুক্ত দেশসমূহের মধ্যে তৃতীয় ( Ref: Click here )। মহিষ পালনের সম্ভাবনা প্রথম ধাপ হল আমাদের পরিবেশের উপযোগী উন্নতজাতের মহিষের প্রচলন যা দেশের সামগ্রিক দুধ উৎপাদনে বিশেষ অবদান রাখবে। উপকূলীয় এলাকায় প্রাকৃতিক সম্পদের প্রাচুর্য ও নিম্ন জলাভূমির উপস্থিত এবং দীর্ঘদিন যাবত মহিষ পালনে অভ্যস্ত কৃষকদের অভিজ্ঞতা ও আধুনিক প্রযুক্তি সাথে সমন্বয় ঘটিয়ে মহিষ পালন ব্যপক লাভজনক উদ্যোগ হতে পারে। বাংলাদেশ প্রাণীসম্পদ অধিদপ্তর কতৃক পরিচালিত ‚বাগেরহাট সরকারি মহিষের খামার“ এ উন্নত জাতের মহিষ উদ্ভাবন মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে মহিষ পালনে নতুন দিগন্তের সূচনা সম্ভব। বি.এল.আই. (বাংলাদেশ প্রাণীসম্পদ গবেষণা প্রতিষ্ঠান) তে মহিষের খামার রয়েছে। মিল্ক ভিটা কতৃক রায়পুর, লক্ষীপুর ও টেকেরহাট, মাদারিপুরে মহিষের খামার পরিচালিত হচ্ছে। লালতীর ভালুকাতেও মহিষের খামার রয়েছে। তুলনামূলকভাবে মহিষের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বেশি হওয়ায় মহিষের মৃত্যুর হার কম ফলে কৃষকের আর্থিকভাবে লাভবান হওয়ার সুযোগ রয়েছে। মহিষ পালনে প্রধান প্রতিবন্ধকতা হল, যথাযথ পরিচর্যা ও সচেতনতার অভাবে অনেক সময় মহিষের বাছুরের মৃত্যুর হার অনেক বেড়ে যায়, কিন্তু আঞ্চলিক প্রাণী চিকিৎসা কেন্দ্রের যথাযথ তত্ত্বাবধানে বাছুরের মৃত্যুর হার হ্রাস করা সম্ভব। দুগ্ধ বাজারজাতকরনের কিছু সমস্যা ব্যাপকভাবে দৃশ্যমান হলেও অদূর ভবিষ্যতে সরকারের কতৃক গৃহীত পদক্ষেপের মাধ্যমে সমাধান সম্ভব।